পৈত্রিক সম্পত্তি বা পিতার রেখে যাওয়া জমি-জমা নিয়ে ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিরোধ আমাদের সমাজে খুব সাধারণ একটি চিত্র।
অনেক সময় সঠিক আইন না জানার কারণে এই বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বাংলাদেশে পৈত্রিক সম্পত্তি বন্টনের নির্দিষ্ট আইনি ও ধর্মীয় নিয়ম রয়েছে।
আজকের ব্লগে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানবো পৈত্রিক সম্পত্তির হিস্যা বন্টন আইন (Muslim & Hindu Inheritance Law) অনুযায়ী পরিবারের কোন সদস্য কতটুকু সম্পত্তির মালিক হন এবং কীভাবে আইনগতভাবে সম্পত্তি বন্টন করতে হয়।
১. মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তির হিস্যা বন্টন
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন (১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ এবং শরিয়াহ আইন) অনুযায়ী পৈত্রিক সম্পত্তি বন্টন করা হয়।
এই আইনে মৃত ব্যক্তির রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
ক) সন্তান ও ভাই-বোনের অংশ (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
পিতার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের অংশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন থাকে। সাধারণ নিয়মটি হলো:
- ছেলে ও মেয়ের অনুপাত: ইসলামি আইন অনুযায়ী, বোনের তুলনায় ভাই দ্বিগুণ সম্পত্তি পাবেন। অর্থাৎ, ছেলে পাবেন ২ ভাগ এবং মেয়ে পাবেন ১ ভাগ (২:১ অনুপাত)।
- শুধু কন্যাসন্তান থাকলে: যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে না থাকে, কেবল একজন মেয়ে থাকে, তবে তিনি মোট সম্পত্তির ২ ভাগের ১ ভাগ (৫০%) পাবেন। আর যদি একাধিক মেয়ে থাকে (কোনো ছেলে না থাকে), তবে সব মেয়েরা মিলে সম্পত্তির ৩ ভাগের ২ ভাগ সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। অবশিষ্টাংশ অন্য দূরবর্তী উত্তরাধিকারীরা পাবেন।
খ) স্ত্রী বা স্বামীর অংশ
- স্ত্রীর অংশ: স্বামী মারা যাওয়ার পর যদি তাদের কোনো সন্তান (কিংবা ছেলের সন্তান) থাকে, তবে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ৮ ভাগের ১ ভাগ (১/৮) পাবেন। আর যদি কোনো সন্তান না থাকে, তবে স্ত্রী পাবেন ৪ ভাগের ১ ভাগ (১/৪)। (একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা এই নির্দিষ্ট অংশটি নিজেদের মধ্যে সমানভাগে ভাগ করে নেবেন)।
- স্বামীর অংশ: স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সন্তান থাকলে স্বামী পাবেন ৪ ভাগের ১ ভাগ (১/৪), আর সন্তান না থাকলে স্বামী পাবেন ২ ভাগের ১ ভাগ (১/২)।
গ) মাতা ও পিতার অংশ
- মাতার অংশ: সন্তান থাকলে মা পাবেন মোট সম্পত্তির ৬ ভাগের ১ ভাগ (১/৬)। সন্তান না থাকলে সাধারণত ৩ ভাগের ১ ভাগ (১/৩) পাবেন।
- পিতার অংশ: মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা পাবেন ৬ ভাগের ১ ভাগ (১/৬)।
২. হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তির হিস্যা বন্টন
বাংলাদেশে বসবাসরত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য সম্পত্তি বন্টনের নিয়ম মুসলিম আইনের চেয়ে ভিন্ন। এটি মূলত জিমূতবাহন রচিত 'দায়ভাগ' আইন দ্বারা পরিচালিত হয়।
ক) সনাতন আইনে মূল উত্তরাধিকারী কারা?
হিন্দু আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি সবার আগে পান তার পুত্র, পৌত্র (নাতি) এবং প্রপৌত্র (পুতির ছেলে)। তারা জীবিত থাকলে অন্যরা সম্পত্তি পান না।
খ) কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর অধিকার (আইনি পরিবর্তন)
- স্ত্রীর অধিকার: একজন হিন্দু বিধবা নারী তার স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে "জীবনস্বত্ব" (Life Interest) লাভ করেন। অর্থাৎ তিনি জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন, কিন্তু বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। তবে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক কিছু রায় অনুযায়ী, হিন্দু বিধবা নারীরা কৃষিজমি ও অকৃষিজমি উভয় ক্ষেত্রেই স্বামীর সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট অংশ পান এবং তা বিক্রির অধিকারও রাখেন।
- কন্যার অধিকার: সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, অবিবাহিত কন্যা এবং পুত্ৰবতী কন্যা (যার ছেলে সন্তান আছে) সীমিত আকারে সম্পত্তি পান। তবে বন্ধ্যা বা শুধু কন্যাসন্তানের মায়েরা পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন।
৩. পৈত্রিক সম্পত্তি বন্টনের আইনি প্রক্রিয়া: 'আপোষ বন্টননামা দলিল'
পৈত্রিক সম্পত্তি শুধু মুখে মুখে বা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলেই আইনগতভাবে তা বৈধ হয় না। ভবিষ্যতে যেকোনো জটিলতা এড়াতে আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পত্তি বন্টন করা উচিত।
ধাপ ১: ওয়ারিশ কায়েম সনদ বা সাকসেশন সার্টিফিকেট
প্রথমেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের কাছ থেকে একটি ওয়ারিশ সনদ (Succession Certificate) নিতে হবে। এতে মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের নাম ও তালিকা থাকে।
ধাপ ২: আপোষ বন্টননামা দলিল (Partition Deed)
সব অংশীদাররা মিলে আলোচনা করে কার অংশে কোন জমিটি পড়বে তা নির্ধারণ করবেন। এরপর একজন সার্টিফাইড আমিন (সার্ভেয়ার) দিয়ে জমি মেপে সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। সবশেষে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে একটি "আপোষ বন্টননামা দলিল" রেজিস্ট্রি করতে হবে।
সতর্কতা: বন্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। দলিল রেজিস্ট্রি না করে নিজেদের মধ্যে স্ট্যাম্পে সই করে জমি ভাগ করলে পরবর্তীতে সেই জমির নামজারি বা বিক্রি করা যায় না।
দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর, প্রত্যেক অংশীদারকে নিজ নিজ অংশের জমি নিজের নামে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে নামজারি (Mutation) করিয়ে নিতে হবে এবং আলাদা খতিয়ান খুলতে হবে।
৪. অংশীদাররা জমি দিতে না চাইলে আইনি প্রতিকার: 'বাটোয়ারা মামলা'
অনেক সময় দেখা যায় বড় ভাই বা প্রভাবশালী কোনো অংশীদার বোনদের বা দুর্বল অংশীদারদের পৈত্রিক সম্পত্তির হিস্যা দিতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে আইনি প্রতিকার রয়েছে:
- বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit): যদি কোনো ওয়ারিশ তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন, তবে তিনি জেলা জজ আদালতে "বাটোয়ারা মামলা" বা " can suit for partition" দায়ের করতে পারেন।
- আদালত তখন সমস্ত কাগজপত্র যাচাই করে সরকারি আমিনের মাধ্যমে জমি মেপে যার যার অংশ বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
শেষ কথা
পৈত্রিক সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে আইন জানার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে সমঝোতা বজায় রাখা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
কারণ বাটোয়ারা মামলা বছরের পর বছর চলতে পারে, যাতে অর্থ ও সময় উভয়ই নষ্ট হয়। জমি কেনা-বেচা, উত্তরাধিকার আইন এবং ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো সঠিক তথ্যের জন্য আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন
